• Breaking News

    ৩২ বছর পর ফেনীর সেই মেহেরজান বিবির ছেলের সন্ধান লাভ


    মুক্তিযুদ্ধে স্বামী হারানো ও শহীদ ৬ সন্তানের জননী ফেনীর সেই মেহেরজান বিবির ছেলের সন্ধান পাওয়া গেছে ৩২ বছর পর । মঙ্গলবার খবর পেয়ে চাঁদপুর থেকে ছুটে এসেছেন তার ছেলে মো. শাহজাহান পাটোয়ারী। বেলা ৩টায় তিনি ফেনীর ধর্মপুর আবাসনে এসে পৌঁছলে মা-ছেলের কান্নার রোল পড়ে যায়।

    এদিকে, মেহেরজান বিবিকে দেখতে বুধবার সকালে ২৫০ শয্যা ফেনী জেলা সদর হাসপাতালে যান জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায়। তিনি মেহেরজান বিবির চিকিৎসার খোঁজ-খবর নেন এবং নগদ অর্থ সাহায্য প্রদান করেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেষে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) পাঠানো হয়েছে।

    এ সময় সিভিল সার্জন ডা: হাসান শাহরিয়ার কবির, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন, হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার অসিম কুমার সাহা, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

    সোমবার রাতে মেহেরজান বিবি ঘরের ভেতরে পড়ে গিয়ে কোমরে প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মেহেরজান বিবিকে ফেনীর একটি বেসরকারী হাসপাতালে এক্সরের জন্য নেয়া হয়। সন্ধ্যায় ফেনী জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায় মেহেরজান বিবির চিকিৎসার সার্বিক খোঁজখবর নেন। তাঁর নির্দেশে রাতেই মেহেরজান বিবিকে ২৫০ শয্যা ফেনী জেলা হাসপাতালের তৃতীয় তলার ৮ নং কেবিনে ভর্তি করা হয়।
    সম্প্রতি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ফেনী রিপোর্ট ডট কমসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার দূরাবস্থার ওপর প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর অনেকেই মেহেরজান বিবির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে শুরু হয় মেহেরজান বিবির হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সন্ধান।

    মেহেরজান বিবির ছেলে মো. শাহজাহান পাটোয়ারী জানান,তার মাকে নিয়ে সংবাদ প্রচারিত হলে মায়ের ছবি দেখে চিনতে পারেন তিনি । এছাড়া সার্জেন্ট ফরিদ নামে সেনা বাহিনীর এক কর্মকর্তা তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তার মায়ের সন্ধান দেন। সেই সূত্রে তিনি ফেনী এসে পৌঁছান।

    তিনি বলেন, ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঢাকার রূপনগরে তিনি মা, ভাইসহ বোনের বাসায় ছিলেন। এই সময়ে তার মায়ের মানসিক সমস্যা দেখা দিলে তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর মা থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। অপরদিকে বোনের বিয়ে হয়ে গেলে তিনি ভবঘুরের ন্যায় চাঁদপুর চলে যান। সেখানে রিকশা চালিয়ে জীবিকা শুরু করেন। পরে সেখানে বিয়ে করে পৌরসভার ১৩ নং ওয়ার্ডের মধ্যম তরপুর চন্ডী গ্রামে ঘর-সংসারী হন। তার ছোট ভাই শাহ আলমও তার সঙ্গে থাকেন। সে গার্মেন্টেসে চাকরি করে।

    শাহজাহান পাটোয়ারী বলেন, তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্রিগেডিয়ার আমিন সাহেবের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতির পর মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হিসেবে আমাদেরকে ঢাকার রূপনগরে ১৬ নং রোডে ৬৩৬ বাড়িটি বরাদ্দ দেন। বিএনপির এক নেতা রাতের অন্ধকারে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেন।

    তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার ৬ ভাই ও বাবা শহীদ হয়েছেন। আমাদের একটি বাড়ি আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমীপে আমাদের আকুল আবেদন, তিনি যেন আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেন। আমাদের বাড়িটা যেন উদ্ধার করে দেন। আমার ছোট ভাইকে যেন একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেন।

    এ ব্যাপারে ফেনী জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায় বলেন, মেহেরজান বিবি সর্ম্পকে আমরা তদন্তে অনেক দূর এগিয়েছি। ইতোমধ্যে তার এক সন্তানের সন্ধান পাওয়া গেছে। কিছু ডুকুমেন্ট পাওয়া গেছে। আমরা এক মাসের মধ্যে তা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

    মেহেরজান বিবি ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর আবাসন ও আশ্রায়ন প্রকল্পের ৩ নং ব্যারাকের ১১ নং কক্ষে দীর্ঘদিন বসবাস করে আসছেন।

    মেহেরজান বিবি ১০ অক্টোবর ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইব্রাহীম উকিল, মাতার নাম বিবি হনুফা। পৈতৃক নিবাস চাঁদপুর সদর উপজেলার বাবুর হাটস্থ ২৬ নং দক্ষিণ তরপুর চন্ডী গ্রামে। ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার ৬নং চরছান্দিয়া ইউনিয়নের বড়ধলী হাজী বাড়ির মরহুম মমতাজ উদ্দিনের পুত্র সুবেদার এ টি এম সামসুদ্দিনের (এলাকায় মেজর সামসুদ্দিন হিসেবে পরিচিত) সঙ্গে মেহেরজান বিবির বিয়ে হয়। পঞ্চাশের দশকে বড়ধলী গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হলে নিঃস্ব হয়ে তারা শহরে চলে যান। ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরে জালাল দারোগার বাড়িতে থাকতেন বলে জানা যায়।